সবকিছু ঠিক থাকলে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই হচ্ছেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। তিনি রাষ্ট্রপতি হলে দলে তৈরি হবে নতুন সমীকরণ। বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্থাৎ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তির দায়িত্ব কে পাবেন, কে হবেন মহাসচিব- এমন আলোচনা জোরালো হচ্ছে দলের ভেতরে। দলের সাংগঠনিক কাঠামো এই পদের ওপর নির্ভর করে।বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপ, কট্টরপন্থা-মধ্যপন্থাসহ সব বিভাজন দূরে সরিয়ে সংগঠনকে এক সুঁতোয় গেঁথে রাখার মূল দায়িত্বটুকু পালন করতে হয় মহাসচিবকেই। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলের কাউন্সিলসহ অদূর ভবিষ্যতের নানা ইস্যু ঘিরে মহাসচিব পদটি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করছে।
একই সঙ্গে মির্জা ফখরুল ২৩তম রাষ্ট্রপতি হলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব এবং তার নির্বাচনি আসনে উপনির্বাচন- এসব বিষয়ও আলোচনার কেন্দ্রে আসছে। যদিও বিএনপি বলছে, একসঙ্গে অনেক পরিবর্তন হলেও এটি দলের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
এদিকে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে রোববার থেকে মনোনয়নপত্র বিক্রি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন কমিশন থেকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে বিএনপি। আর রাষ্ট্রপতি পদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী করা হয়েছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে।
এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনায় ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী থাকায় এবার জাতীয় সংসদে ভোটাভুটির মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। ১৯৯১ সালের পর দেশে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও কোনোবারই ভোটের প্রয়োজন হয়নি। প্রতিবারই একজন প্রার্থী থাকায় তিনি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এবার একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোটেই নির্ধারিত হবেন রাষ্ট্রপতি।
বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানান, আজ কিংবা আগামীকালের মধ্যে দলীয়ভাবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। দলীয় পর্যায়ের আলোচনায় রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম বিবেচনার ক্ষেত্রে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলের প্রতি আনুগত্য এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা গেছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, পরে পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন। এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিব। এখন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। এ দীর্ঘ সময়ে তার বিরুদ্ধে করা হয়েছিল ১১১টি মামলা। কারাগারে যেতে হয়েছে ১১ বার। প্রায় সাড়ে তিন বছর বন্দি ছিলেন। এসব বিবেচনায় জোর আলোচনায় রয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে মির্জা ফখরুলের নাম।
গত ১ আগস্ট গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির এক বৈঠক হয়। সেখানে দীর্ঘ আলোচনার পর রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন আগামী ১৩ আগস্ট। ইতিমধ্যেই গত রোববার বিএনপির পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এবং বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নির্বাচন কমিশন থেকে মনোনয়নপত্র দুটি সংগ্রহ করেন। তবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় প্রার্থীর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে বিএনপির সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক প্রশ্ন তৈরি হবে- দলের মহাসচিবের দায়িত্ব নেবেন কে? দলীয় পর্যায়ের আলোচনায় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম এ ক্ষেত্রে আলোচনায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও গণমাধ্যমে দলের বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার সক্রিয় ভূমিকা দৃশ্যমান। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের নামও মহাসচিব পদে জোর আলোচনায় রয়েছে।আবার আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে সরকারে এ দুজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের কাজে ব্যস্ত থাকায় সাংগঠনিক দিকটি দেখার ভার সরকারের বাইরের কোনো দলীয় নেতাকে দেওয়া হতে পারে।
জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গণমাধ্যমকে বলেন, আমি দলের প্রতি শতভাগ আনুগত্য প্রকাশ করেই কাজ করছি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশেই এখনও দলের নেতাকর্মীদের পাশে আছি।
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়ে দলে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কিছুই জানি না। দল দায়িত্ব দিলে তখন বলা যাবে, চিন্তা করব।’
বিএনপির মূল গঠনতন্ত্রে সরাসরি ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ বলে সুনির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী পদের উল্লেখ নেই। তবে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মহাসচিবের অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা পদ শূন্য হলে দলের চেয়ারম্যান তার বিশেষ সাংগঠনিক ক্ষমতাবলে যেকোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ হিসেবে সাময়িক দায়িত্ব অর্পণ করতে পারেন।
দলের গঠনতন্ত্রে মহাসচিবের কার্যাবলি ও ক্ষমতা সম্পর্কে আলাদাভাবে সুনির্দিষ্ট বা বিস্তারিত কোনো ধারা উল্লেখ নেই। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের চেয়ারম্যান বা প্রধানের সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশনাই মহাসচিব পদের মূল পরিচালিকা শক্তি। গঠনতন্ত্রে দলের মহাসচিব জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে বিশেষ বা জরুরি পরিস্থিতিতে দলের চেয়ারম্যানের হাতে মহাসচিব নিয়োগ, পদায়ন বা যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ সাংগঠনিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
আবার রিজভীকে মহাসচিব করা হলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদটি কাকে দেওয়া হবে সেটি নিয়েও আলোচনা চলছে। এক্ষেত্রে যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও হাবিব উন নবী খান সোহেলের নাম বিবেচনায় আছে।
এদিকে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তার ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) সংসদীয় আসনটি শূন্য হবে। সেখানে শিগগিরই উপনির্বাচনের আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন।


